ভেষজ গুণে অনন্য একটি ফল আমলকি। এর ফল ও পাতা দুটিই ব্যবহার করা হয় ঔষধরূপে। বিভিন্ন অসুখ সারানো সহ আমলকি রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতেও দারুণ সাহায্য করে। আয়ুর্বেদিক ঔষধেও এখন আমলকির নির্যাস ব্যবহার করা হয় আমলকির গুণাগুণের ফলে।
আমলকির পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা রয়েছে প্রচুর। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এই ফলটি আমাদের অনেকের কাছেই পছন্দনীয়। আমলকি খেতে যদিও প্রথম দিকে একটু কস কস লাগে তবে শেষ দিকে মিষ্টি লাগে। আমলকির পুষ্টিগুন অন্যান্য যে কোন ফলের চাইতে কোন অংশে কম নয়। আমাদের দেশে এই ফলটি সব জায়গায় পাওয়া যায়।
নিয়মিত আমলকি খেলে মুখের রুচি বাড়ে এবং দাঁতের যে কোন সমস্যা বিশেষ করে স্কার্ভি বা দন্তরোগ সারাতে টাটকা আমলকির জুড়ি নেই। তাছাড়া আমলকির আরো উপকারিতা রয়েছে যেমন জন্ডিস, লিভার, পেটের পীড়া, সর্দি, কাশি ও রক্তহীনতার জন্যও খুবই উপকারী। আমলকির পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
পুষ্টিগুণঃ
আমলকীতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি ছাড়াও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম আমলকীতে ভিটামিন সি আছে ৪৬৩ মিলিগ্রাম।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, আমলকিতে কাগজি লেবুর চেয়ে ৩ গুণ বেশি ও পেয়ারার চেয়ে ১০ গুণ বেশি ভিটামিন সি বিদ্যামান। তাছাড়া আমলকিতে কমলার চেয়ে ১৫ থেকে ২০ গুণ বেশি, আমের চেয়ে ২৪ গুণ বেশি, কলার চেয়ে ৬০ গুণ বেশি এবং আপেলের চেয়ে ১২০ গুণ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে।
গবেষকরা বলেন, একজন পূর্ণবয়স্ক নারীর প্রতিদিন ৭৫ মিলিগ্রাম এবং পূর্ণবয়স্ক পুরুষের ৯০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি খাওয়া উচিত। দিনে দুটো আমলকি খেলেই এই পরিমাণ ভিটামিন সি পাওয়া যায়। এতে বুঝা যায় আমলকির পুষ্টিগুন কত।
১০০ গ্রাম আমলকীতে পানি ৯১.৪ গ্রাম, ক্যালরি ৯৬ (শক্তি), খনিজ পদার্থ ০.৭ গ্রাম, প্রোটিন ০.৯ গ্রাম, আয়রন ১.২ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩৪.০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ১০.০২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ ২০.০৮ মিলিগ্রাম, ৯ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন (এ ফলের ক্যারোটিন ভিটামিন এ’র কাজ করে)। প্রতি ১০০ গ্রাম আমলকীতে আরো রয়েছে ০.০৩ মি.গ্রা থায়ামিন, ০.০১মি.গ্রা রিবোফ্লেভিন, ১.২ মি.গ্রা লৌহ, ৫০ মি.গ্রা ফসফরাস।
আরও পড়ুনঃ আমের পুষ্টিগুন ও উপকারিতা
উপকারিতাঃ
- আমরা জানি আমলকি, বহেড়া ও হরিতকী কে একত্রে ত্রিফলা বলা হয়। পেটের অসুখ দূরে চলে যায় যদি এ তিনটি শুকনো ফল একত্রে রাতে ভিজিয়ে রেখে সকালবেলা ছেঁকে খালি পেটে শরবত হিসেবে নিয়মিত খাওয়া হয়।
- আমলকির রস পাইলস ও কোষ্ঠকাঠিন্যের জটিলতা দূরীভূত করে। তাছাড়াও এটি বমি ও বদহজম থামাতে সাহায্য করে।
- বিভিন্ন ধরনের তেল তৈরি করা হয় আমলকি দ্বারা। খুব তাড়াতাড়ি ঘুম আসার সম্ভবনা থাকে যদি কাঁচা বা শুকনো আমলকি বেটে একটু মাখন মিশিয়ে মাথায় লাগানো হয়।
- এছাড়া কাচা আমলকি বেটে এর রস প্রতিদিন চুলে লাগিয়ে দু-তিন ঘন্টা রেখে দিতে হবে। এভাবে একমাস মাথায় মাখলে চুলের গোড়া শক্ত, চুল ওঠা এবং তাড়াতাড়ি চুল পাকা বন্ধ হয়।
- দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি ও চোখ ভালো রাখতে এটি ভূমিকা রাখে। আমলকীতে বিদ্যমান ক্যারোটিন চোখের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে রয়েছে ফাইটো-কেমিক্যাল যা চোখের সঙ্গে জড়িত ডিজেনারেশন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
- এছাড়াও চোখের নানাবিধ সমস্যা যেমন চুলকানি, চোখের প্রদাহ এবং পানি পড়া থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
- আমলকি চুলের পরিচর্যার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং চুলের টনিক হিসেবে কাজ করে। এটি কেবল চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে তা নয় এটি চুলের গোড়াও মজবুত করে। এটি চুল পড়া বন্ধ করে, এটি ব্যবহারে চুলে খুসকি থাকেনা ও চুল পাকা বন্ধ হয়।
- হজম সমস্যা কেটে যাবে যদি আধা চূর্ণ শুষ্ক ফল এক গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে নিয়মিত খাওয়া হয়। পেটের হজমে আরও সাহায্য করে, যদি খাবারের সঙ্গে আমলকির আচার খাওয়া হয়।
- প্রত্যহ আমলকির রস পান করলে নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ দূরীভূত হয় এবং তা দাঁত শক্ত রাখায় ভূমিকা পালন করে।
- শরীরের অপ্রয়োজনীয় ফ্যাট কমাতে সাহায্য করে আমলকি।
- প্রতিদিন সকালে আমরা আমলকির রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেতে পারি। এতে ত্বকের কালো দাগ দূর হবার পাশাপাশি ত্বকের উজ্জ্বলতাও দিন দিন বৃদ্ধি পাবে।
- এক গ্লাস পানি অথবা দুধের সাথে আমলকির গুঁড়া ও সামান্য চিনি মিশিয়ে দিনে দু’বার পান করলে অ্যাসিডিটির সমস্যা ধীরে ধীরে কমে যাবে।
- আমলকির তেঁতো ও টক স্বাদ, মুখের স্বাদ ও রুচি বাড়ায়। আমলকির গুঁড়ার সাথে সামান্য মধু ও মাখন মিশিয়ে, খাবারের পূর্বে খেতে পারলে রুচি ও ক্ষুদা বাড়ানো সম্ভব ।
- শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
- ব্রঙ্কাইটিস ও অ্যাজমার জন্য আমলকীর জুস উপকারী।
- এটি মস্তিষ্কের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসকে শক্তিশালী করে। আমলকির মোরব্বা বা আচার মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা দূর করে।
- রক্তশূন্যতা দূরীকরণে বেশ ভাল কাজ করে।
- শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান বৃদ্ধি পাওয়া ও সেল ডিজেনারেশন প্রতিরোধ করতে সহযোগীতা করে।
- আমলকি একজন ব্যক্তিকে কার্যক্ষম করে তোলে, পেশি মজবুত করাতে ভূমিকা রাখে এবং শরীর ঠাণ্ডা রাখে।
- লোহিত রক্তকণিকার পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে দাঁত ও নখ ভাল রাখতে অবদান রাখে।
- ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে, ব্লাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে। যথেষ্ট সাহায্য করে কোলেস্টেরল লেভেল কম রাখতে।
- অনেকের সুস্থ-স্বাভাবিক ত্বক রুক্ষ হয়ে ফেটে যায়। অনেকের আবার ফাটে পায়ের গোড়ালি। আমলকীর রস তাদের জন্য উপকারী। কিছু সময় লাগিয়ে রাখার পর ধুয়ে ফেলতে হবে।
- ঠাণ্ডা-কাশি ও গা ব্যথা দূর করতে আমলকীর সমকক্ষ কিছু নেই বললেই চলে। হালকা গরম পানিতে মধুর সঙ্গে আমলকী খেলে ঠাণ্ডা দূর হয়। আবার আমলকীর রস আদার গুঁড়ার সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ব্যথা প্রশমিত হয়।
- ত্বক, চোখ ও চুল ভালো রাখতেও আমলকীর ভূমিকা ব্যাপক।
- আমলকীর রসে রয়েছে অ্যামিনো অ্যাসিড ও প্রোটিন, যা চুলের পুষ্টি জোগায়। চুল পড়া রোধ করে। কাঁচা আমলকী খেতে যাদের একদমই অনীহা, স্বস্তি বোধ করেন না; তারা মধুর সঙ্গে আমলকীর রস খেতে পারেন।
- যৌন স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে আমলকী অনেক কার্যকরী মহাঔষধ। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের মতে, প্রতিদিন আমলকীর জুস খেয়ে যৌন স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব। এর পাশাপাশি এটি শুক্রাণুর উৎপাদনও বৃদ্ধি করে।
- নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ? আমলকী খেলে নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ দূরীভূত হয় এবং দাঁতের গোড়া শক্ত হয়।
- আমলকির রস দেহ থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ ছেঁকে বাহিরে ফেলে দেয়।
- লিভার ভালো রাখে।
- যাদের রাতে ভালো ঘুম হয় না অর্থাৎ অনিদ্রা, তারা নারকেল তেলের সঙ্গে আমলকীর রস মিশিয়ে ঘুমানোর আগে মাথায় দিতে পারেন। এতে করে সুখনিদ্রা হবে।
পরিশেষে বলা বাহুল্য, যদিও আমলকি এখন বছর জুড়েই ক্রয় করা যায়, তবে ভেষজ এই ফল বছর জুড়ে ঘরেও সংরক্ষণ করে রাখা যায়। আমলকি মাঝারি আকার করে কেটে মিনিট তিনেক পানিতে ফুটিয়ে নেয়ার পর লেবুর রস, লবণ, আদা কুচি ও সরিষার তেল মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে সারা বছর সংরক্ষণ করা যায়।

Be the first to comment